বুধবার,  ২১ অক্টোবর ২০২০  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০১৯, ১৫:৪১:২৪
আফগান-তালেবান শান্তি চুক্তি

নারী অধিকার নিয়ে আলোচনার পথ সুগম হবে?

ডেস্ক রিপোর্ট
আফগানিস্তানের সঙ্গে নতুন আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবান বিদ্রোহীদের মধ্যে নতুন শান্তি চুক্তি হচ্ছে। এতে ভবিষ্যত আফগান সরকারে নারীর অধিকার হরণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমতাবস্থায়, চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির আওতায় আফগানিস্তানকে অবশ্যই ভয় ও শোষণমুক্ত হবে বলে মন্তব্য করেছেন ওয়াশিংটনে নিযুক্ত আফগান রাষ্ট্রদূত রয়া রহমানি।
রয়া কোনো রাজপরিবার কিংবা কোনো সম্ভ্রান্ত পরিবার থেকে আসেননি। যখন যুক্তরাষ্ট্রে আফগানিস্তানের রাষ্ট্রদূত হিসেবে তাকে নিযুক্ত করা হয় তখন তিনি খুব অবাক হয়েছিলেন। তবে এখন তিনি বুঝতে পেরেছেন যে, ট্রাম্প প্রশাসনের চাপের কারণে তালেবানের সঙ্গে শান্তি চুক্তির পাশাপাশি নারীর অধিকার নিয়ে কাবুলের প্রতিশ্রুতি বোঝাতেই তাকে এই পদে নিযুক্ত করেছে।
দীর্ঘ সময় ধরে নারী অধিকারকর্মী হিসেবে কাজ করছেন রয়া। ১৯৯০-এর দশকে তালেবানের শাসনামলে আফগানিস্তানের অবস্থা স্মরণ করে বলেন, তখন নারীদের বাড়ির বাইরে যাওয়া এবং মেয়েদের স্কুলে পড়া বা চাকরি করা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
মার্কিন দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমসকে চলতি সপ্তাহে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সবাই আশা ছেড়ে দিয়ে জীবিত লাশের মতো জীবনযাপন করতো। অথচ আজ আফগান ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে ২৮ শতাংশই নারী, যা মার্কিন কংগ্রেসের নারী সদস্যের চেয়ে বেশি।
তবে তালেবান ও যুক্তরাষ্ট্র যতই প্রাথমিক শান্তি চুক্তির দিকে অগ্রসর হচ্ছে, প্রায় দুই দশক ধরে আফগান নারীরা যে অর্জন করেছেন তা হারাবে বলে আশঙ্কা বাড়ছে।
এই চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত ১৪ হাজার মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের রূপরেখা এবং তালেবান ও আফগান সরকারের মধ্যে ভবিষ্যতের আলোচনার পথ সুগম করবে বলে আশা করা হচ্ছে। চুক্তিটি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন ও তালেবানের মধ্যে কয়েক মাস ধরে আলোচনা চলে। তবে প্রাথমিক চুক্তিতে নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সরকারে সমান সুযোগ থাকবে তা সুনিশ্চিতভাবে আশা করা যায় না বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তরা।
ভবিষ্যতের আলোচনাগুলোতে নারীর অধিকারের দিকে নজর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই আলোচনাগুলোর ফলাফল হতে পারে আফগান সরকার ও তালেবানের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগি। যদিও কিছু মার্কিন ও আফগান কর্মকর্তা বলেছেন, তালেবান অতীতের তুলনায় নারীদের অধিকারকে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তবে চূড়ান্ত চুক্তিতে হয় নারীদের নাম মাত্র সুযোগ সুবিধা দেওয়া হবে অথবা তাদের সম্পূর্ণ রুপে উপেক্ষা করা হবে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।
মার্কিন সিনেটের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির একমাত্র নারী ডেমোক্র্যাট সিনেটর জিন শাহিন বলেন, আফগান নারীরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে তারা কোনো রকম নিপীড়ন ছাড়াই শান্তি চায়। যুদ্ধ বিধ্বস্ত আফগানিস্তানের উন্নয়ন ও এগিয়ে যাওয়ার পথে নারীরাই যে সবচেয়ে বড় সম্পদ ট্রাম্প প্রশাসনের এটা বোঝা উচিত।
তিনি আরো বলেন, আলোচনায় তাদের অধিকার ও ভবিষ্যৎ যেন কোনোভাবেই বাদ না পরে সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
২০০১ সালে আফগানিস্তান থেকে তালেবানকে ক্ষমতাচুত করে মার্কিন সেনারা। এর পর থেকে সেখানকার নারীরা সত্যিকারে বাইরে আসা শুরু করে। বর্তমানে সাড়ে ৩০ লাখেরও বেশি মেয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এবং ১০ লাখ নারী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। মার্কিন কর্তৃপক্ষের অনুমান, শিক্ষক, আইনজীবী, প্রশাসন ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে কর্মরত আছেন প্রায় ৮৫ হাজার আফগান নারী। দেশটিতে সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে চার শতাধিক নারী রাজনৈতিক কাজে অংশ নিয়েছিলেন। তবে এসব অর্জনের বেশিরভাগই রাজধানী কাবুল ও তার আশেপাশের বড় শহরের নারীদের।
এদিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তালেবান আবার তাদের ভিত মজবুত করেছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের দিকে।
আফগানিস্তান পুনর্গঠন বিষয়ক বিশেষ মহাপরিদর্শকের অফিস জানিয়েছে, এই গোষ্ঠীটি আফগানিস্তানের জনসংখ্যার কমপক্ষে ১০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে, দেশটির ৪০৭ জেলার ৫৯ টি।
শান্তি আলোচনার পরবর্তী ধাপ হিসেবে আফগান ও মার্কিন কর্মকর্তারা একটি চিরস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তির পরিকল্পনা করছে। এই যুদ্ধবিরতি চুক্তি ও আফগান নারীদের জন্য শান্তি নিশ্চিত করতে পারবে না বলে মনে করেন রয়া রহমানি। তিনি বলেন, ‘সবার জন্য শান্তিপূর্ণ পরিবেশ মানে শুধু অস্ত্র বা বোমার অনুপস্থিতি নয়। সবার জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মানবিক দিকগুলো বিবেচনা করতে হবে।’
৪১ বছর বয়সী রয়ার বেড়ে উঠা কাবুলে। ১৯৯২ সালে আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে তিনি প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের পেশাওয়ারে পালিয়ে যান। ওই সময়ে তালেবান জঙ্গি গোষ্ঠী মাথাচারা দিয়ে উঠে। এরপর ১৯৯৮ সালে তিনি পরিবার নিয়ে ফের কাবুলে ফিরে আসেন। সেই সময়কার কাবুলের পরিস্থিতি দেখে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পরেছিলেন। তিনি বলেন, কাবুল তখন এক ভীতিকর শহরে পরিণত হয়েছিল। সবাই তাদের বাড়ির জানালা কম্বল বা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতেন যেন তালেবানের ধর্মরক্ষক পুলিশ বাহিনী কোনো কিছু দেখতে না পারে।
২০০৪ সালে আফগানিস্তানে গৃহীত সংবিধানে নারী ও পুরুষ উভয়ের সমান অধিকার ও দায়িত্ব নিশ্চিত করা হয়। সংবিধানে বৈষম্য নয় বরং নারীদের পর্যাপ্ত শিক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়। এতে বলা হয়, এর সমস্ত বিধান ও আইন ইসলামী বিধিবিধানের অন্তর্ভুক্ত।
তালেবান গত ফেব্রুয়ারি এক বিবৃতিতে বলেছে, ইসলামে নারীদের যে সব অধিকার রয়েছে সেগুলো তারা স্বীকৃতি দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষা, চাকরি, সম্পত্তির উত্তরাধিকার ও স্বামী বেছে নেওয়ার ক্ষমতা।
রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর একটি ফোরামে দেওয়া ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তালেবানের নীতি হল ‘নারীর অধিকারকে এমনভাবে রক্ষা করা যাতে তাদের বৈধ অধিকারগুলো লঙ্ঘিত না হয় এবং তাদের মানবিক মর্যাদা ও আফগান মূল্যবোধ হুমকির সম্মুখীন না হয়।’
তবে বিবৃতিতে পশ্চিমা সংস্কৃতি ও ধর্মের অনৈতিক ও অশোভন প্রভাবগুলোর কথাও বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, এর মাধ্যমে নারী অধিকারের নামে আফগানিস্তানের মূল্যবোধ লঙ্ঘন করতে উত্সাহিত করা হচ্ছে নারীদের।
তালেবান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি আলোচনায় অংশ নেয়া আফগান কর্মকর্তা ও মানবাধিকার কর্মীরা জানান, ২০০১ সালের পর থেকে তালেবানের চিন্তা চেতনায় পরিবর্তন এসেছে।
কাতারের দোহায় অনুষ্ঠিত ওই শান্তি আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন মানবাধিকার কর্মী আসিলা ওয়ার্দার। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন ইনস্টিটিউট ফর উইমেন, পিস অ্যান্ড সিকিউরিটির এক ফোরামে বলেন, ‘আলোচনায় একটি বিষয় আমরা লক্ষ্য করেছি যে, এতে অংশ নেয়া তালেবান সদস্যরা সেই ১৮/২০ বছর আগের তালেবানের মতো ছিল না ।
তিনি বলেন, সেখানে তালেবান আলোচকদের সঙ্গে আফগান নারীদের নিয়ে কথা বলার এবং তাদের উদ্বেগের বিষয়টি তুলে ধরার অনেক সম্ভাবনা ছিলো।
লন্ডনভিত্তিক ওভারসিজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট বলেছে, আফগানিস্তানের কয়েকটি জেলাতে স্থানীয় কর্মকর্তাদের সাথে মিলে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আইন প্রয়োগ ও কর সম্পর্কিত নানা বিষয়ে কাজ করছে তালেবানের ছায়া সরকার। বর্তমান অবস্থা ২০০১ সালের বিপরীত। ওই তালেবান বিদ্রোহীরা ক্ষমতা দখল নিয়ে ব্যস্ত ছিল।
তবে আফগান ইস্যুতে বিশেষজ্ঞরা তালেবানের এই দাবি সম্পর্কে সন্দীহান। তারা বলেছেন, তালেবান নারীর অধিকারকে সমর্থন করে- এটি তাদের একটি ঘোষণা মাত্র। আরো জঘন্য বিষয় হলো আফগানিস্তান জুড়ে নারীদের ক্রমাগত আক্রমণ, হুমকি ও নির্যাতনের কথা অস্বীকার করেছে তালেবান সদস্যরা। অপরদিকে তাদের নেতারা বলেছেন যে, তারা শান্তি চান।
চলতি বছরে পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর ফারাহর কাছে তালেবান নিয়ন্ত্রিত এলাকায় মেয়েদের স্কুলগুলোতে হামলা এবং দেশের পূর্বাঞ্চলে গজনি প্রদেশে নারীদের দ্বারা পরিচালিত একটি রেডিও স্টেশন বন্ধ করে দিতে বাধ্য করা ভিন্ন কিছুই নির্দেশ করে। তবে ফারাহ শহরের বাইরে ওই হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে তালেবান।
যুক্তরাষ্ট্রের কাউন্সিল ফর ফরেন রিলেশন্স' ওমেন অ্যান্ড ফরেন পলিসি প্রোগ্রামের ফেলো গেইল জেমাক লেমন বলেন, তালেবান তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে কি করছে তা দেখার জন্য ২০০১ সালের দিকে তাকাতে হবে না। আপনাকে ২০১৭,১৮ ও ১৯ সালের দিকে তাকালেই চলবে।
তালেবান নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে মেয়ের ঘর থেকে বাইরে যাওয়া বা কাজ করা, বিশেষ করে মেয়েদের স্কুলে যাওয়া বা নারীদের জনসমাবেশে অংশ নেওয়া খুবই কঠিন বলে জানান তিনি। 
মার্কিন ভারপ্রাপ্ত উপ-পররাষ্ট্র মন্ত্রী অ্যালিস জি ওয়েলস জোর দিয়ে বলেছেন, চূড়ান্ত চুক্তিতে অবশ্যই নারীদের অধিকার  নিশ্চিত করতে ও সুরক্ষা দিতে হবে। অন্যথায় তালেবান আন্তর্জাতিক সমর্থন ও সহায়তা হারাতে পারে  বলে সতর্ক করেছেন তিনি। -নিউইয়র্ক টাইমস
 
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com