বুধবার,  ২১ অক্টোবর ২০২০  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০১৯, ২১:২২:১৪
দেশপ্রেমের চশমা

চারিদিকে শুধু ধর্ষণ আর ধর্ষণ!

মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার
রাজশাহী শহরে পর পর দুটি নারী নির্যাতনের ঘটনা দেখে কেউ যদি মনে করেন যে, রাজশাহীতে নারী লাঞ্ছনা বেড়ে গেছে তা ভুল হবে। ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনা এখন কেবল রাজশাহীর নয়, এটা এখন সারা দেশের নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি আগস্ট মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ‘প্রধানমন্ত্রী গোল্ড মেডেল’ পদকপ্রাপ্ত রুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের শিক্ষক রাজশাহী শহরের প্রাণকেন্দ্রে বখাটেদের লাঞ্ছনার কবল থেকে স্ত্রীর সম্ভ্রম বাঁচাতে গিয়ে ‘সোনার ছেলেদের’ মারধরের শিকার হন। এ ঘটনাটির বর্ণনা দিয়ে ওই শিক্ষক একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস দেয়ায় ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের একটি ওয়েবপেজে (ইউট্যাব) এ নিয়ে অনেক লেখালেখি ও মতবিনিময় হয়। চারিদিকে নিন্দার ঝড় বইতে থাকে। শিক্ষকের স্ত্রীর সম্ভ্রমহানির এ খবরের রেশ কাটার আগেই আবারও গত সোমবার ১৯ আগস্ট রাজশাহীর ওই একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী যৌন নির্যাতনের শিকার হন।
এ শিক্ষার্থীর ভাষ্যমতে রুয়েট থেকে অটোরিকশায় বাসায় ফেরার পথে তিনি নির্যাতনের শিকার হন। অটোরিকশায় দু’জন সিনিয়র শিক্ষার্থী এবং একজন অপরিচিত যাত্রী ছিলেন। কিছুদূর গিয়ে তারা নেমে যান। অটোরিকশাচালক তখন নিজের লোক তুলবেন বলে তাকে নেমে যেতে বলার সঙ্গে সঙ্গে চার গুণ্ডা অটোরিকশায় উঠে পড়ে এবং তাকে যৌন নির্যাতন করে।
এ সময় ছাত্রীটি চিৎকার করলে চালক হাসতে থাকে। পরে নগর ভবনের সামনে পুলিশ দেখে চার গুণ্ডা ছাত্রীটিকে অটোরিকশা থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে দ্রুত অটোরিকশা নিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এ নিয়ে ছাত্রীটি একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস দেন। তিনি ঘটনার বিবরণ দিয়ে লেখেন, ‘এইটা বাংলাদেশ, কোনো বিচারের আশা আমি করছি না। অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে আমার পোশাক কী রকম ছিল? আমার পোশাক সাধারণ বাঙালি নারীর মতো সালোয়ার কামিজ ছিল।’
প্রথমে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলেও পরে অবশ্য এ ছাত্রী মামলা করেন। মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে একটি বিভাগীয় শহরের প্রাণকেন্দ্রে পর পর এহেন নারী লাঞ্ছনার ঘটনা নাগরিক সমাজের মনে ভীতি ছড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে নারীরা এখন স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে ভয় পাচ্ছেন। তবে আগেই বলেছি, এ দুটি ঘটনা থেকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে না যে এটি কেবল রাজশাহীর ঘটনা।
এ চরম নিন্দনীয় রাজশাহীর নারী লাঞ্ছনার দুটি ঘটনা দেশবাসীকে আতঙ্কিত করলেও ঘটনা দুটির বিশ্লেষণ আমাদের সামনে কিছু নতুন বৈশিষ্ট্য উপস্থাপন করে।
 
বৈশিষ্ট্যগুলো হল-
১. নারীরা আগের চেয়ে সাহসী হয়েছেন। তারা এখন আগের মতো লোক-লজ্জার ভয়ে নারী নির্যাতনের ঘটনা চেপে গিয়ে নির্যাতনকারীদের নিরাপদে থাকতে দিচ্ছেন না। তারা তা প্রকাশ করার সাহস দেখাচ্ছেন। 
২. ঘটনা প্রকাশ করে থানায় যেতে তারা আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। তাদের মধ্যে এমন ধারণা গড়ে উঠেছে যে থানায় গেলে বিচার পাওয়া যাবে না। সে কারণে তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ঘটনা প্রকাশ করার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন।
৩. নারী লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটলেও তারা ঘরে মনমরা হয়ে বসে থাকছেন না। সতর্ক হয়ে চলাফেরা করলেও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে চেষ্টা করছেন।
৪. সম্প্রতি স্কুল ও মাদ্রাসার কোমলমতি কম বয়সী মেয়েরাও যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর তা প্রকাশ করার সাহস দেখিয়েছে।
৫. এর একটি নেতিবাচক দিক হচ্ছে ধর্ষকরা যখন বুঝতে পারছে যে এ ঘটনা ধর্ষিতা ফাঁস করে দেবেন এবং এতে তাদের বিপদ হবে, তখন অনেক ক্ষেত্রেই তারা ধর্ষণ বা গণধর্ষণের পর ধর্ষিতাকে হত্যা করছে। তারপরও নারীদের মধ্যে ঘটনা চাপা না দিয়ে প্রকাশ করার এ সাহস জেগে ওঠা ভালো লক্ষণ। এর ফলে ধর্ষকরা বুঝবে যে তাদের অপকর্ম চাপা থাকবে না। আর অপকর্ম প্রকাশ পেলে তাদের শাস্তি হবে। সে কারণে তারা এহেন অপকর্মে নিরুৎসাহিত হতে পারে। কিন্তু তারপরও ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনা কমছে না। প্রতিটি বিভাগে, প্রতিটি জেলা-উপজেলায় নারীরা অব্যাহতভাবে লাঞ্ছিত হচ্ছেন।
ধর্ষণ এবং নারী লাঞ্ছনার ঘটনার উদাহরণ দিতে গেলে বলে শেষ করা যাবে না। তবুও দু-চারটি উদাহরণ দেয়া যাক। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের প্রিন্ট মেকিং ডিসিপ্লিনের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র পাপ্পু কুমার মণ্ডল জুলাই মাসে বাইরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এক শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসে এনে যৌন নির্যাতন করে গা ঢাকা দেয়।
পরে ক্যাম্পাসে এলে শিক্ষার্থীরা তার মুখে কালি লাগিয়ে তাকে ক্যাম্পাস থেকে তাড়িয়ে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট পরে এ ছাত্রকে বহিষ্কার করে। বরিশালের ইসলাম পাড়ায় এক তরুণীর আশ্রয়দাতা দম্পতিকে বেঁধে রেখে বখাটে যুবকরা ওই তরুণীকে ধর্ষণ করে এবং আশ্রয়দাতাকে উলঙ্গ করে ওই তরুণীর সঙ্গে তার ভিডিও ধারণ করে তরুণীকে নিয়ে পালিয়ে যায়।
ঢাকার ধামরাইয়ে সপ্তম শ্রেণির মাদ্রাসা ছাত্রীকে কোচিং করতে যাওয়ার পথ থেকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে এক পরিত্যক্ত বাড়িতে ধর্ষণ করে রাজু নামের এক বখাটে যুবক। পঞ্চগড়ে ভ্যানচালক আবদুর রাজ্জাকের দাখিল পাস মেয়ে আসমাকে নিয়ে নিখোঁজ হয় প্রেমিক বাঁধন। পরে ঢাকার কমলাপুর স্টেশনের পরিত্যক্ত বগির টয়লেট থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।
ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক বলেন, হত্যার আগে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল। পাবনার সদর উপজেলার শিবরামপুরে ঘরে ঢুকে চার যুবক গভীর রাত থেকে সকাল ১১টা পর্যন্ত এক নারীকে ধর্ষণ করে পালিয়ে যায়। ফরিদপুর সদর উপজেলায় ১৭ বছরের কিশোরীকে আটকে রেখে ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া যায়। পরে ধর্ষিতার মা থানায় মামলা করেন।
কক্সবাজার মহেশখালীতে ১৫ বখাটে যুবক মিলে এক তরুণীকে গণধর্ষণ করে। ধর্ষণের ঘটনা চাপা দিতে স্থানীয় ইউপি মেম্বারদের ধর্ষকরা টাকা দেয়। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার দারুল হুদা মহিলা মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক মুস্তাফিজুর রহমান ‘হুজুরের কথা শোনা ফরজ, না শুনলে গুনাহ হবে’- ইত্যাদি মিথ্যা হাদিস বানিয়ে কোমলমতি ছাত্রীদের ধর্ষণ করে।
খবর পেয়ে র‌্যাব তাকে গ্রেফতার করে। নেত্রকোনার কলমাকান্দায় ৮ম শ্রেণির শারীরিক প্রতিবন্ধী ছাত্রীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ করে মোটরবাইক চালক আকবর আলী। ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে কলেজ ছাত্রীকে বাসায় একা পেয়ে প্রতিবেশী চানু সিং তার সহযোগী মোশাররফের সহযোগিতায় রিভলবার দেখিয়ে ধর্ষণ এবং ধর্ষণের ভিডিও করে।
ওই ভিডিও ইন্টারনেটে ছাড়ার ভয় দেখিয়ে ওই ছাত্রীকে একটি হাসপাতালে নিয়ে আবার ধর্ষণ করা হয়। যশোরের খড়কিতে ৩ সন্তানের জনক আমিনুর খড়কি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৬ ছাত্রীকে বিভিন্ন সময় চকলেট এবং ফল খাবার প্রলোভন দেখিয়ে বাগানে নিয়ে ধর্ষণ করে। মাদারীপুর সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ এনে মামলা করেন নির্যাতিত শিক্ষিকা।
ঝিনাইদহে সেজিয়া বাজারের নাজ ফার্মেসিতে ৭ম শ্রেণির ছাত্রীকে ইনজেকশন পুশ করে ধর্ষণ করে এক পল্লী চিকিৎসক। পরে পুলিশ ধর্ষককে গ্রেফতার করে। বগুড়ার ধুনটে এক সন্তানের বাবা আফিল উদ্দিন ৭ম শ্রেণির ছাত্রীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ করে।
রংপুরের তারাগঞ্জে কিশোরী স্বপ্না আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। এভাবে বলতে থাকলে কোনো জেলা বা উপজেলাকে নারী নির্যাতনের ঘটনার তালিকা থেকে বাইরে রাখা যাবে না। কাজেই রাজশাহী শহরে পর পর দুটি নারী লাঞ্ছনার সংবাদ দেখে রাজশাহীতে নারী নির্যাতন বেড়েছে ভাবার কোনো সুযোগ নেই।
দেশব্যাপী ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনার একটি ক্রমান্বয় বৃদ্ধি লক্ষ করা যাচ্ছে। ২০১৮ সালের চেয়ে ২০১৯ সালে এ ঘটনা আরও বেড়েছে। কেবল বখাটে যুবকরাই যে নারী ধর্ষণে জড়িত বিষয়টি তেমন নয়। বেকার, বখাটে, ডাক্তার, কর্মকর্তা, কর্মচারী, শিক্ষক, মাদ্রাসার হুজুর, ইমাম, এক কথায় সব শ্রেণির মানুষকে ধর্ষকের তালিকায় পাওয়া যাচ্ছে।
অনেকক্ষেত্রে ধর্ষকরা প্রযুক্তির আশ্রয় নিচ্ছে। তারা ধর্ষণের ভিডিও করে পরে ওই ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়ার কথা বলে ধর্ষিতাকে ব্ল্যাকমেইল করে আবারও তাকে ধর্ষণ করছে। তাছাড়া অশিক্ষিত ও অল্পশিক্ষিত বখাটেদের হাতে অ্যানড্রয়েড ফোন থাকায় এদের অনেকেই পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে ধর্ষণে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। স্কুল ছাত্রদের মধ্যেও এ প্রবণতা আছে। এ কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে।
ধর্ষণের পর যারা ধরা পড়ছে, বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতায় তাদের সহজে শাস্তি হচ্ছে না। অনেকক্ষেত্রেই তারা জামিন নিয়ে বের হয়ে আসছে। প্রধানমন্ত্রী নারীর ক্ষমতায়নের ওপর যে জোর দিয়েছিলেন, নারীরা সর্বক্ষেত্রে যদি নির্যাতনের শিকার হন তাহলে তা কেমন করে কার্যকর হবে? যারা ধর্ষণের মতো অপকর্মে জড়িত, তারা কারও কথা বা সদুপদেশ শুনছে না।
বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে কোনো সদুপদেশ দেয়া হলে তা মোটেও অনুসৃত হচ্ছে না। কারণ, যাদের এ উপদেশ দেয়া হচ্ছে তারা ভালো করেই জানে, এরা কোন প্রক্রিয়ায় গত দুটি নির্বাচনে এমপি হয়েছেন।
ফলে তাদের প্রতি যদি শ্রদ্ধা না থাকে তাহলে তারা তাদের সদুপদেশ শুনবে কেন? বিচারহীনতার সংস্কৃতিও ধর্ষকদের আশকারা দিচ্ছে। অনেকে, বিশেষ করে যারা রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছে, তারা বড় বড় হত্যাকাণ্ডের বিচার না হতে দেখে ভাবছে, তারা কোনো অপরাধ করলেও তার বিচার হবে না। রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকার কারণে তারা অপরাধ করেও নিষ্কৃতি পাবে। এমন ভাবনা অমূলক নয়।
কাজেই ধর্ষণ কমাতে হলে আইন করে বা সদুপদেশ দিয়ে চেষ্টা না করে গোড়ায় হাত দিতে হবে। সমাজ থেকে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে হবে। সর্বক্ষেত্রে সুশাসন তথা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারকে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীন হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
আর এ জন্য সবার আগে সমাজ ও রাজনীতিতে স্বাভাবিকতা সৃষ্টি করতে হবে। রাজনীতিতে সংকট আর সমাজে অস্থিতিশীলতা ও অস্থিরতা জিইয়ে রেখে যত চেষ্টাই করা হোন না কেন, ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন কমানো যাবে না।
 
লেখক: ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার
অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
akhtermy@gmail.com
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com